প্রজন্ম২৪ ডেস্ক
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) ‘বাংলাদেশে হামের পুনুরুত্থান: আজকের সংক্রমণ ও আগামীদিনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে (Measles Resurgence in Bangladesh: Today's Infection, Tomorrow's Risk)’ সেন্ট্রাল সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৮ মে সোমবার এ ব্লক অডিটোরিয়ামে সেন্ট্রাল সেমিনার সাব কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে হাম প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ, আক্রান্তদের জীবন রক্ষায় শিশুদের মায়ের বুকের দুগ্ধ পান নিশ্চিত করা, এ ক্যাপসুল খাওয়ানোসহ ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন জোরদার, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা এবং ভ্যাক্সিনেশন বা টিকাদান কর্মসূচী দ্রুত বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করা হয়।
শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেসমিন মোর্শেদ তাঁর উপস্থাপিত প্রবন্ধে বলেন, হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ কিন্তু টিকা কভারেজের ঘাটতির কারণে প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ৫ বছরের কম বয়সী ও অপুষ্ট শিশুদের ঝুঁকি বেশি এবং জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। টিকাদান, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও দ্রুত চিকিৎসাই হাম নিয়ন্ত্রণের মূল উপায়।
ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা ‘হাম: নির্মূলের স্বপ্ন থেকে প্রাদুর্ভাবের বাস্তবতা’ বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে বলেন, একসময় বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে হাম রোগ নির্মূলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যাপক টিকাদান, গণসচেতনতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতির ফলে বহু দেশে হামের সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। বাংলাদেশেও ইপিআই কর্মসূচী সম্প্রসারণের মাধ্যমে শিশুর টিকাদান বৃদ্ধি পাওয়ায় হামজনিত মৃত্যু ও জটিলতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবারও বিভিন্ন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। টিকা গ্রহণে অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়া, অপুষ্টি, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অভিবাসন ইত্যাদি কারণে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। ফলে সমাজে হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। হাম শুধু একটি সাধারণ জ্বর-র্যাশের রোগ নয়; এটি নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস, ডায়রিয়া এবং ইমিউন এ্যামনেশিয়ার মতো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমান পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয় যে, হাম নির্মূলের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু টিকা আবিষ্কার যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সবার জন্য সমান টিকাদান নিশ্চিত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা। নির্মূলের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতেই হবে।
ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম রাশেদ উল ইসলাম তাঁর ‘বাংলাদেশে হামের পুনরুত্থান: আজকের সংক্রমণ, আগামী দিনের ঝুঁকি’ বিষয়ক প্রবন্ধে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় হাম সংক্রমণ চলছে এবং টিকাদান ঘাটতি ও বিলম্বিত ইপিআই ডোজের কারণে শিশুদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ফাঁক তৈরি হয়েছে, যার ফলে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া (প্রায় ৩৯ শতাংশ), ডায়রিয়া (২৯ থেকে ৩৮ শতাংশ), এনসেফালাইটিস (১:১০০০), কানের সংক্রমণ ও ভিটামিন এ ঘাটতির কারণে অন্ধত্ব দেখা দেয় এবং হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মৃত্যুহার প্রায় ১৪.৪ শতাংশ যা টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে সর্বাধিক। হাম ভাইরাস SLAM/CD150 ও Nectin-4 রিসেপ্টরের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে লিম্ফোসাইট ধ্বংস করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে এবং দীর্ঘমেয়াদে CNS আক্রান্ত করে SSPE সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি এটি পূর্ববর্তী রোগ প্রতিরোধ স্মৃতি মুছে দিয়ে শিশুদের ২ বছর পর্যন্ত অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলে; দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টি, বৃদ্ধি বিলম্ব, পুনরাবৃত্ত সংক্রমণ এবং মারাত্মক SSPE বা ভাইরাসের কারণে বিরল স্নায়ুবিক জটিলতা ও মস্তিষ্কের প্রদাহ (৭ থেকে ১০ বছর পর প্রকাশ) দেখা দেয়। টিকা নেওয়া শিশুদের মধ্যে রোগ তুলনামূলকভাবে হালকা হয় এবং মৃত্যুহার কমে যায়। অন্যদিকে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুহার সর্বাধিক। হাম মহামারী শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত ভিড় সৃষ্টি করে, অক্সিজেন ও চিকিৎসা সম্পদের উপর চাপ বাড়ায় এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত করে। তাই জরুরি টিকাদান, ভিটামিন এ সাপ্লিমেন্টেশন, পুষ্টি পুনর্বাসন, নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রম শক্তিশালীকরণ ও কভারেজ মনিটরিং অপরিহার্য। মূল বার্তা কথা হলো হাম প্রতিরোধযোগ্য তাই টিকা নিন, সচেতন থাকুন।
সেন্ট্রাল সেমিনার সাব কমিটির সভাপতি ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আফজালুন নেছা এর সভাপতিত্বে এবং ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. খালেদ মাহবুব মুর্শেদ (মামুন) এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক, রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত ও জ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় পরিণত হয়।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএমইউ’র উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ, উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বক্তব্য রাখেন।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ তাঁর বক্তব্যে রোগীদের সেবা প্রদানকালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য রোগীর স্বজনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি জোরালে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, চিকিৎসকদের উপর হামলা চালিয়ে চিকিৎসাসেবায় বাধা দেবেন না, মুক্তমনে চিকিৎসা করতে দিন। তবেই আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব। হামের বিষয়ে তিনি বলেন, বিএমইউতে হামে আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবায় আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত বিএমইউতে চিকিৎসাধীন হামে আক্রান্ত কোনো শিশু মারা যায়নি।
উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, হাম মোকাবিলায় বর্তমান সরকার দ্রুত সকল জটিলতা নিরসন করে হামের টিকাদান কার্যক্রম শুরু করেছে। ইতোমধ্যে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে। সরকার, চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মীরা হাম মোকাবিলায় নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যার বেশি বেশি প্রচার হওয়া জরুরি এবং এতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে।
উপ-উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার তাঁর বক্তব্যে হামকে অতি সংক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপর গুরুত্বারোপ করেন।
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার তাঁর বক্তব্যে হামে আক্রান্ত শিশুদের জীবন রক্ষায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিশুদের মায়েদের বুকের দুগ্ধপান নিশ্চিত করা, অপুষ্টি দূরীকরণ এবং সার্বিক ও সঠিক ব্যবস্থাপনার উপর জোর তাগিদ দেন।