প্রজন্ম২৪ ডেস্ক
দুই দশক পুরোনো শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা হালনাগাদ ও শব্দের মাত্রা পরিমাপে সারাদেশে রিয়েল-টাইম মনিটরিং যন্ত্র বসানোর কথা থাকলেও বাস্তবে তা কিছুই করা হয়নি। উল্টোদিকে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের ৪৪ কোটি টাকার লুটপাট করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ কোটি টাকা প্রশিক্ষণ ব্যয় দেখিয়ে লুটপাট করেছেন প্রকল্প পরিচালক ফরিদ আহমেদ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. ফজলে এলাহী।
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করেও কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি পরিবেশ অধিদপ্তর। আবার এর মধ্যে ১৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা প্রচারণামূলক সামগ্রী কিনতেই ব্যয় দেখানো হয়। শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০০৬ সংশোধনের প্রস্তাব এখনও বাড়ানো হয়নি। দেশের ৬৪ জেলায় শব্দ পরিমাপক মনিটরিং স্টেশন স্থাপনের লক্ষ্যে ১৩টি রিয়েল-টাইম মনিটর বসানোর কথা বলা হলেও
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বাস্তবে এসব যন্ত্র কোথাও স্থাপন করা হয়নি।
এ বিষয়ে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক ফরিদ আহমেদ বলেন, প্রকল্পের সকল ব্যয়ই পূর্ব অনুমোদিত এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় হয়েছে। প্রকল্পে কিছু কাজ পিছিয়ে যাওয়ায় এক বছরের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। কিছু কাজ বাকি থাকায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। আইএমইডির অভিযোগগুলো বাস্তবসম্মত নয়। তারা আমাদের সঙ্গে সমন্বয় না করেই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
জানা গেছে, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল দুই দশক পুরোনো শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা হালনাগাদ ও শব্দের মাত্রা পরিমাপে সারাদেশে রিয়েল-টাইম মনিটরিং যন্ত্র বসানো কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। বরং প্রকল্পের প্রায় ২৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে পোস্টার, ক্যালেন্ডার, প্রশিক্ষণসহ নানা উপহার সামগ্রীর পেছনে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদি ‘ইন্টিগ্রেটেড অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি প্রজেক্ট টু কন্ট্রোল নয়েজ পলিউশন’ নামের এই প্রকল্পের মোট
বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ৪৪ কোটি টাকা—যার একটি বড় অংশই অপ্রয়োজনীয় খাতে গেছে বলে জানিয়েছেপরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আই এম ইডি)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু প্রচারণামূলক সামগ্রী কিনতেই ব্যয় হয়েছে ১৭কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে পোস্টার, ফেস্টুন, খাতা, কলম ও ব্যাগ। ৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, পরিবহন শ্রমিক সহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য। পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিস সূত্রে জানাগেছে, প্রকল্পের এসব ব্যয়বহুল সামগ্রী কলমদানি, ক্যালেন্ডার, পেপার ওয়েট কর্মকর্তাদের ডেস্কে শোভা পাচ্ছে। এ ধরনের সামগ্রী বিভিন্ন প্রকল্প থেকেই তৈরি ও বিতরণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় কেনা হয় টি-শার্ট, ক্যাপ, ব্যাগ, বুকলেট, খাতা ও কলমসহ প্রচুর পরিমাণে সচেতনতামূলক উপকরণ। আইএমইডি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পে এসব সামগ্রীর ব্যবহার হয়েছে খুব কম,বেশিরভাগই পড়ে আছে অপ্রয়োজনে। একাধিক পণ্যের জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে বাজার দরের পাঁচ-সাত গুণ বেশি। যেমন মাত্র ১২ পৃষ্ঠার একটি টেবিল ক্যালেন্ডার তৈরিকরতে খরচ দেখানো হয়েছে ১ হাজার টাকা, যার বাজারমূল্য ১০০ থেকে ১২০ টাকা।কলমদানি কেনা হয়েছে প্রতিটি ১ হাজার টাকায়, যার বাজারদর ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। অথচ কাগজে-কলমে এ বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
এছাড়াও প্রকল্পের আওতায় দেশের প্রতিটি জেলায় ২টি করে মোট ১২৮টি শব্দসচেতনতামূলক বিলবোর্ড স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা, প্রতিটির জন্য খরচ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। এছাড়া ৬০টি স্থানে
বসানো সাইনবোর্ডের প্রতিটির মূল্য ধরা হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। অফিস সরঞ্জামাদি কেনায় ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যার মধ্যে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা খরচ হয়েছে ৩০০টি সাউন্ড মিটার কেনায় প্রতিটির দাম ৩৮ হাজার
টাকা হিসেবে। তবে মাঠপর্যায়ে এসব যন্ত্রের কার্যকর ব্যবহার দেখা যায়নি।
শব্দের মাত্রা পরিমাপ, প্রদর্শন ও রিয়েল টাইম মনিটরিং যন্ত্র ১৩টি স্থাপনের জন্য ব্যয়দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। জেলার বিভিন্ন স্থানে শব্দ দূষণবিষয়ক সাইনবোর্ড বসানো হলেও সেগুলোর সঙ্গে কার্যকর কোনো পরিমাপক যন্ত্র সংযুক্ত ছিল না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক ও সেন্টার ফর অ্যাটমসফেরিক পলিউশন স্টাডিজের চেয়ারম্যান ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, শব্দ দূষণ এখন শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, ছড়িয়ে পড়েছে জেলা-উপজেলাতেও। এই প্রকল্পে যে টাকা খরচ হয়েছে, তা বাস্তব সমাধানে কাজে আসেনি।
অপরদিকে প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফজলে এলাহীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
তথ্যসুত্র- ইনকিলাব