প্রজন্ম24
, ঢাকা
ঢাকা জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণাধীন মার্কেটের আয় থেকে বঞ্চিত সরকার। ঢাকা জেলা পরিষদ মার্কেটের মূল নকশা পরিবর্তন করে অবৈধভাবে নির্মিত ৬৮টি দোকান বিক্রি ও ভুয়া রসিদে ভাড়া আদায়ের মাধ্যমে কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক তদন্তে অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য মিলেছে। জেলা পরিষদ মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী জানান, জেলা পরিষদের অসাধু কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেছেন। দুদক বিষয়টি তদন্ত করছে। দীর্ঘ দিন যাবত বার্ষিক ১২ হাজার টাকা ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ মেহেদী হাসান ও পিয়ন শুকুর মিয়ার কাছে নগদে ভাড়া পরিশোধ করে আসছেন। তবে তাকে কখনো ভাড়ার রসিদ দেওয়া হয়নি। এছাড়াও প্রতিটি দোকান থেকে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেয়া হতো। দোকান বরাদ্দের নির্ধারিত মূল্য ছাড়াও প্রতিটি দোকান বাবদ জেলা পরিষদকে সালামি দিতে হয়েছে এক থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
জানা যায়, ঢাকার কেরানীগঞ্জের জেলা পরিষদ মার্কেটের দুটি ভবনে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত মোট ৫০৪টি দোকান রয়েছে। এর মধ্যে ৪৩৬টি বৈধভাবে নির্মিত ও বিক্রি হয়েছে। বাকি ৬৮টি দোকান নকশা পরিবর্তন করে অবৈধভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। রেজিস্টারে যার কোনো উল্লেখ নেই। এগুলো বিক্রি করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন খন্দকার, সার্ভেয়ার লোকমান হোসেন, উচ্চমান সহকারী শেখ মো. মাসুদ পারভেজ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা কে এম রাশেদুজ্জামানের সমন্বয় তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি দীর্ঘদিন তদন্ত শেষে কালিগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটের প্রথম ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে ১২টি, দ্বিতীয় ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে ৫০টি, ভবনের নিচতলায় দুইটি, ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি, ভবনের চতুর্থ তলায় দুইটি, প্রথম ভবনের পঞ্চম তলায় দুইটি এবং দক্ষিণ পাশের বর্ধিত অংশে একটিসহ মোট ৬৮টি অবৈধ দোকান খুঁজে পেয়েছেন। বিগত আওয়ামী শাসনামলে ৬৮টি দোকান অবৈধভাবে বিক্রি করেছেন ঢাকা জেলা পরিষদের নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মেহেদী হাসান। তবে শুধু বিক্রি করেই নীরব থাকেননি, বিক্রির পর ভুয়া রসিদ তৈরি করে জেলা পরিষদের নামে ভাড়া আদায় করে আত্মসাৎ করেছেন। তার আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ প্রায় এক কোটি। এছাড়া কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ মেহেদী হাসানের নিয়োগে জালিয়াতির তথ্যও পেয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা।
প্রাপ্ত তথ্যে আরো জানা যায়, ঢাকা জেলা পরিষদের নিন্মমান সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর রিয়াজত উল্লাহ উচ্চমান সহকারী পদে পদোন্নতি পাওয়ায় এবং নিন্মমান সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটরের ১টি পদ শূন্য হওয়ায় উক্ত পদে নিয়োগের জন্য মো. মেহেদী হাসান হাইকোর্টে রীট পিটিশন দায়ের করেন। তখন ঢাকা জেলা পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন মো. মেহেদী হাসানের চাচা মো. ছিদ্দিকুর রহমান। প্রতিযোগিতা না করার জন্য তিনি ও তার চাচা সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিদ্দিকুর রহমান জেলা পরিষদের এক আইনজীবীকে ম্যানেজ করে অর্ডার করান। ঢাকা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে নিয়োগ প্রদানের জন্য চাপ প্রদান করলেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম নিয়োগ প্রদানের অপারগতা প্রকাশ করেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কখনই কোন কর্মচারী নিয়োগ দিতে পারেন না বলে জানান।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, নিয়মবহির্ভূত দোকান বরাদ্দ ও বরাদ্দকৃত দোকানের টাকা উত্তোলনে মাধ্যমে ভুয়া রশিদ ব্যবহারের তথ্য প্রমাণ পেয়েছেন। তথ্য পেয়েছেন দুর্নীতি ও অনিয়ম করে চাকরি নেয়ারও। কালিগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেটের প্রধান সহকারী হিসেবে প্রীতি রানী ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন উচ্চমান সহকারী মো. সোবাহান। ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে আসছেন নিম্নমান সহকারী মেহেদী হাসান। কালিগঞ্জ জেলা পরিষদের দুর্নীতি ও অনিয়ম ২০০৪ সাল থেকে শুরু হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে মেহেদী হাসানের সময়কালে। তিনি দায়িত্বে থাকাকালে জেলা পরিষদকে না জানিয়ে জেলা পরিষদের দুটি ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে ৫০টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মেহেদী হাসানের পূর্বে যে দুর্নীতি অনিয়ম হয়েছে তা তিনি গোপন রেখেছেন। তাই দুর্নীতি ও অনিয়মের সকল দায়দায়িত্ব মেহেদী হাসানের ওপর বর্তায় বলে মনে করে তদন্ত কমিটি।
ঢাকা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মামুন খন্দকার জানান, জেলা পরিষদ মার্কেটে কী পরিমাণ অনিয়ম হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি ভবনের ৬৮টি দোকানে অনিয়মের তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি দোকান চিহ্নিত করা গেছে। ২০০৪ সালের ঘটনা। আন্ডারগ্রাউন্ডে যাদেরকে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কতদিনের ভাড়া বকেয়া আছে এ বিষয়টি তদন্ত করার জন্য কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। নিম্নমান সহকারী মেহেদী হাসান ২০১৮ সাল থেকে অদ্যাবধি উক্ত দায়িত্বে চাকরি করছেন। তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে যদি অনিয়ম খুঁজে পায় তাহলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়াসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দেওয়া হবে।
ঢাকা জেলা পরিষদের নিম্নমান সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মেহেদী হাসানের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে কল করার হলে তিনি রিসিভ করেন নি।