আলমগীর রেজা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবনব্যবস্থার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। এই কৃষিখাতকে আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই করে গড়ে তুলতে যে কয়েকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তার মধ্যে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম। শতবর্ষেরও বেশি ঐতিহ্য ধারণকারী এই প্রতিষ্ঠান শুধু কৃষিবিদ তৈরির ক্ষেত্রেই নয়, কৃষি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং জাতীয় উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৩৮ সালে "বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট" (Bengal Agricultural Institute) নামে। তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার কৃষি শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, কৃষকবন্ধু এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক। তাঁর কৃষিবান্ধব চিন্তা ও দূরদর্শিতার ফলেই এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি রচিত হয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি কৃষি শিক্ষার প্রসারে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে থাকে। পরবর্তীতে ২০০১ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় "শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়"। এর মাধ্যমে দেশের কৃষি শিক্ষায় নতুন এক দিগন্তের সূচনা হয়।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কৃষি, কৃষি অর্থনীতি, কৃষি ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, ভেটেরিনারি, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা প্রদান করা হয়। আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, গবেষণা খামার এবং দক্ষ শিক্ষকবৃন্দের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীরা যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছেন।

ছবি ---- আলমগীর রেজা
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ, রোগ ও পোকামাকড় দমন এবং কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করছেন। এসব গবেষণার ফল দেশের কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করছে।
বাংলাদেশের কৃষিতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, তার পেছনে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য শিক্ষক, গবেষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীর অবদান রয়েছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে নতুন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিল্প-শিক্ষা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কার্যকর সংযোগ স্থাপন এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তর করতে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। কৃষকের কল্যাণ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ভবিষ্যতেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে। কৃষির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করা সময়ের অপরিহার্য দাবি। কারণ, শক্তিশালী কৃষি শিক্ষা ও গবেষণাই পারে একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল এবং উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।